
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পুষ্টির চাহিদা ও খাদ্যাভ্যাসের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি। এ সময় সুস্থ থাকতে শুধু পুষ্টিকর খাবার খাওয়াই নয়, কোন খাবার কতটা খাওয়া হচ্ছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। স্বাদের কারণে অনেকেই নিয়মিত এমন কিছু খাবার খান, যেগুলো অতিরিক্ত গ্রহণ করলে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ওজনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে ষাট বছর বয়সের পর প্রক্রিয়াজাত মাংস, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্য, ভাজাপোড়া খাবার এবং বেশি লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো। এসব খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে পরিমাণ ও গ্রহণের ঘনত্ব কমিয়ে পুষ্টিকর বিকল্প বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
১. প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, বেকন ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত মাংসে সাধারণত সোডিয়াম ও সংরক্ষণকারী উপাদান বেশি থাকে। নিয়মিত এসব খাবার বেশি পরিমাণে খেলে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রক্রিয়াজাত মাংসের অতিরিক্ত গ্রহণ হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে এ ধরনের খাবার কম খাওয়া ভালো। এর পরিবর্তে তাজা মাছ, মুরগির মাংস এবং উদ্ভিদজাত প্রোটিনের উৎস, যেমন ডাল, ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের শিমজাতীয় খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
খাবারের স্বাদ বাড়াতে অতিরিক্ত লবণ বা প্রক্রিয়াজাত উপাদানের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ভেষজ ও মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্যাভ্যাসে এমন ছোট পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।
২. চিনিযুক্ত পানীয়
কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি মেশানো ফলের পানীয় এবং অন্যান্য মিষ্টি পানীয় শরীরে দ্রুত ক্যালরি যোগ করে। এসব পানীয় নিয়মিত বেশি পরিমাণে পান করলে ওজন বেড়ে যাওয়া এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্রিয়তা কমে গেলে ক্যালরির চাহিদাও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি। তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ পানি ভালো বিকল্প। পানিতে স্বাদ আনতে চাইলে লেবু, শসা বা বিভিন্ন ফলের টুকরা মেশানো যেতে পারে। চিনি ছাড়া ভেষজ চাও আরেকটি বিকল্প।
চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে এসব পানীয় বেছে নিলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমানো সহজ হয়। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সহায়তা মিলতে পারে।
৩. সাদা পাউরুটি
সাদা পাউরুটি সহজলভ্য ও খেতে সুবিধাজনক হলেও এতে পূর্ণ শস্যের তুলনায় খাদ্যআঁশ কম থাকে। পরিশোধিত ময়দা দিয়ে তৈরি হওয়ায় এর শর্করা শরীরে তুলনামূলক দ্রুত ভাঙতে পারে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবার নির্বাচনের সময় এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার।
এর বিকল্প হিসেবে পূর্ণ শস্যের আটার রুটি, লাল চাল, ওটস এবং অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ শস্য খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবারে থাকা খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে পারে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
পূর্ণ শস্যের খাবার হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের পূর্ণ শস্য রাখলে শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
৪. ভাজাপোড়া খাবার
পুরি, সিঙাড়া, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া খাবারে প্রচুর ক্যালরি ও চর্বি থাকতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার নিয়মিত খেলে ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বারবার ব্যবহার করা তেলে ভাজা খাবার এ ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগের কারণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ ওজন এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানো ভালো। এর পরিবর্তে খাবার সেদ্ধ, বেক বা গ্রিল করে খাওয়া যেতে পারে। এসব পদ্ধতিতে তুলনামূলক কম তেল ব্যবহার করেও খাবারের স্বাদ বজায় রাখা সম্ভব।
রান্নায় বিভিন্ন মসলা, ভেষজ ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করলে অতিরিক্ত তেল বা লবণ ছাড়াই স্বাদ বাড়ানো যায়। এভাবে রান্নার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা সহজ হয়।
৫. পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার
পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুধ, ক্রিম, মাখন ও কিছু দুগ্ধজাত খাবারে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। এসব খাবার অতিরিক্ত খেলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে যেতে পারে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দুগ্ধজাত খাবার নির্বাচনে সচেতন থাকা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী কম চর্বিযুক্ত দুধ ও দই বেছে নেওয়া যেতে পারে। উদ্ভিদজাত বিকল্পের মধ্যে সয়া, আমন্ড ও ওটস দিয়ে তৈরি পানীয়ও রয়েছে। তবে এসব বিকল্পের পুষ্টিমান এক নয়। বিশেষ করে প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে চাইলে পণ্যের পুষ্টিতথ্য দেখে নির্বাচন করা ভালো। চিনি ছাড়া এবং ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন দিয়ে সমৃদ্ধ করা সয়া পানীয় একটি বিকল্প হতে পারে।
সচেতনভাবে দুগ্ধজাত খাবার বেছে নিলে সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখার প্রচেষ্টাও সহায়তা পেতে পারে।
৬. অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত লবণ বা সোডিয়ামযুক্ত খাবার উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যগত ঝুঁকি। টিনজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, প্যাকেটজাত নাশতা, আচার ও বিভিন্ন প্রস্তুত খাবারে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সোডিয়াম গ্রহণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এ ঝুঁকি কমাতে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া এবং কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া ভালো। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় পুষ্টিতথ্যের তালিকায় সোডিয়ামের পরিমাণ দেখে নেওয়া যেতে পারে। ঘরে রান্না করলে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। খাবারের স্বাদ বাড়াতে লবণের পরিবর্তে লেবু, রসুন, আদা ও বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে যাঁদের চিকিৎসক নির্দিষ্ট পরিমাণে লবণ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁদের সেই নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
৭. পেস্ট্রি ও কেক
পেস্ট্রি, কেক ও অন্যান্য মিষ্টিজাত বেকারি খাবারে সাধারণত চিনি, পরিশোধিত ময়দা এবং চর্বি বেশি থাকে। নিয়মিত বেশি পরিমাণে এসব খাবার খেলে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের কারণে ওজন বেড়ে যেতে পারে। কিছু খাবারে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণও বেশি থাকে, যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খাবার প্রতিদিন খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে আনা ভালো। মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ করতে তাজা ফল বা চিনি ছাড়া দই বেছে নেওয়া যেতে পারে। ঘরে কেক তৈরি করলে চিনির পরিমাণ কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে পূর্ণ শস্যের আটা ব্যবহার করাও একটি বিকল্প।
তবে পূর্ণ শস্যের আটা ব্যবহার করলেই কেক স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। এতে চিনি ও চর্বির পরিমাণও বিবেচনায় রাখতে হবে। খাবার নির্বাচনে সচেতন হলে স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।
ষাট বছর পার হলেই এসব খাবার সবার জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এমন নয়। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, দৈনন্দিন কাজকর্ম, ওজন এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের মতো সমস্যা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। সুষম খাবার, পরিমিত আহার এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বয়স বাড়ার সঙ্গে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।



